উদ্ভিদের সাথে পরিচিতিঃ সুখদর্শন Crinum asiaticum

0
82

“সুখদর্শনের সময় হয়েছে”

আগে শিশির ভাইয়ার বাসাতে যখন থাকতাম তখন কার্জনহল আসতাম নীলক্ষেত হয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ত্বরণ গেটের রাস্তা ধরে। দুই রাস্তার মাঝে লাগানো অনেক ধরনেরই উদ্ভিদের দেখা পেয়ে ভালোই লাগতো হাটতে। আমার সাথে গল্পে সঙ্গ দিতো আমার ভাই  জামান। একদম যেন মুখস্তই হয়েগেছিলো কোনটার পরে কোনটা আছে। তখন সবগুলার নাম না জানলেও উদ্ভিদগুলো পরিচিত হয়ে উঠেছিলো। হঠাৎ একদিন দেখলাম রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের গেটের সামনে যেখানে দুই রাস্তার মাঝের লনটা শেষ হয়েছে সেখানে খুব সুন্দর ফুল ফুটেছে।

সাদা সুখদর্শন (Crinum asiaticum)

সাদা বর্ণের ফুল। ফুলটার আলাদায় সৌন্দর্য আছে। পাপড়িগুলো চারপাশে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে দেখে মনে হয় একটা অক্টপাস তার হাতগুলো ছড়িয়ে রেখেছে চারপাশে অথবা একটা মাকড়শা তার আট পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর হলুদ বর্ণের পুংকেশর গুলো সেই ছড়ানো পাপড়ির ফাক দিয়ে বাইরে বের হয়ে আছে। যে উদ্ভিদটাতে এই ফুলগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সেটা দেখতে কিছুটা ঘৃতকুমারীর (Aloe vera) মত হলেও কিন্তু অনেক পার্থক্য আছে এই দুটা উদ্ভিদে। যাইহোক, উদ্ভিদটার পাতা গুলোও নজরকাড়া,  এই ধরনের পাতা এর আগেও দেখেছি কিন্তু এত বড় দেখেনি।

একদম  লম্বা পুরু বাঁশ পাতার মত কিন্তু বিশাল বড় সাইজের আর মসৃণ, চেলচুকচুকে সবুজ।   হাত দিয়ে মাপতে গিয়ে দেখি পাতার তুলনায় হাতই ছোট। অনেকক্ষণ দেখার পর একটা ছবি তুলে রওনা দিলাম আবার ক্লাসের উদ্দেশ্যে।  যেতে যেতে দেখি আরো বিভিন্ন জায়গায় এই উদ্ভিদের ফুল ধরে আছে। ভালোই লাগছিলো সেগুলো দেখে।

যেতে যেতে আবার মনে হলো এই ধরনের পাতাওয়ালা উদ্ভিদ তো জুয়োলোজি ডিপার্টমেন্টের সামনে দেখেছি। তাহলে সেখানে যেয়ে ফুলগুলো নিয়ে আরো কিছু সময় ভাবা যাবে। সেখানে যেয়ে দেখলাম একই ধরনের পাতা হলেও সেখানে এখনো পুরোপুরি ফুল আসে নি। শুধু মাত্র কুড়ি হয়েছে কিন্তু এই কুড়িগুলোর বর্ণ সাদা না, একটু লাল কিংবা ম্যাজেন্টা বর্ণের।

গোলাপি সুখদর্শন(Crinum asiaticum )

এখন কি করা যায়? দুইটাই কি একি উদ্ভিদের আলাদা আলাদা বর্ণের ফুল নাকি দুইটা আলাদা দুইটা প্রজাতি?
এই নিয়ে তো মহা বিপদে পড়লাম। নামই জানি না তার উপর আবার এই ধরনের সমস্যা।  তখন এই নিয়ে আর কিছু চিন্তা ভাবনা করি নি।

কিছুদিন পর একটা বইতে পৃষ্ঠা উলটাতে উলটাতেই চোখে পড়লো সেই ফুলটার পরিচয়। নাম দেয়া ছিলো সুখদর্শন। ফুলটি দেখলে সুখ পাওয়া যায় কিনা জানি না তবে নাম টা খুব সুন্দর। সাথে বাংলা আরেকটা নাম হলো বড় কানুর। বৈজ্ঞানিক নাম Crinum asiaticum L. ইংরেজি নামের সাথের কল্পনার মিল হয়েছে, ইংরেজি নাম spider lily কিন্তু আরেকটা ইংরেজি নাম দেখে একটু চিন্তাই হয়েছিলাম। নাম দেয়া ছিলো poisonous bulb. তাহলে কি এর যে দেহ সেটা বিষাক্ত। গতদিন তো অনেকক্ষণ পাতা ধরে নাড়াচাড়া করেছিলাম এবার কি হবে এটা ভেবে একটু ভয় পেয়েছিলাম। এটার রস স্কিনে পড়লে বিভিন্ন ধরনের জ্বালা পোড়া হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো অথবা খেয়ে ফেললে পাকস্থলীতে সমস্যা করতো, সহ্য না করতে পারলে সাথে সাথে বমিও করতে পারতাম, পেটের পীড়াও শুরু হতে পারতো এমনকি ডাইরিয়াও হয়ে যেতে পারতো, ভাগ্যিস খেয়ে দেখি নি ভেবে স্বস্থির নিশ্বাস ফেললাম। যদি কেউ না জেনে অত্যাধিক পরিমানে ব্যবহার করে তাহলে প্যারালাইজড পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।

আমার বন্ধু শামীম সব সময়ই বলে অপরিচিত কোনো কিছু দেখলে মুখে দিবা না। যাক বেঁচে গেছি তাহলে।

সুখদর্শন Amaryllidaceae পরিবারের একজন সদস্য দেখে একবার একটু সন্দেহ হলো। সাধারণত বাল্ব জাতীয় উদ্ভিদ গুলো liliaceae পরিবারের সদস্য হয় কিন্তু এটা আবার কি পরিবারের কথা বলছে। অনেককিছু খুঁজতে শুরু করলাম সঠিক তথ্য জানার জন্য। পরথেকে জানতে পারলাম আসলে নাম স্পাইডার লিলি হলেও এটা সত্যিকার অর্থে লিলি না। দেখতে কিছুটা লিলির মত তাই রূপক নাম তার।

পরে একদিন টি.এস.সি.তে কি করতে যেন গেছিলাম। সেখানে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে যাবো বলে  মেন গেট ঢুকতেই ডানে চোখ গেলো একটা ফুলের দিকে। কিছুক্ষণ ভাবলাম এটাই কি সেই গোলাপি সুখদর্শনটা যেটা ফোটার অপেক্ষায় জুয়োলোজির সামনে সময় দিচ্ছিলাম এতদিন। ভালোই হলো পেয়েগেলাম অবশেষে তাহলে। ছবি তুলেনিলাম সেই  অপরূপার। তবে আরো একটা বিষয় খেয়াল করেছিলাম যে এটির সাইজ ফুলেও বড় পাতাতেও সাদাটার তুলনায় বড়। দেহের চেয়ে পাতা তিন চার গুন বড়। তবে সবকিছুই হুবহু একই রকম।
অবশেষে বুঝতে পারলাম এইদুটো উদ্ভিদ আসলে আলাদা কোনো প্রজাতি না। একই প্রজাতিই কিন্তু একটু আলাদা দেখতে।

এই উদ্ভিদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ যৌগ আছে।
রাইজোম ল্যাটিফিন,N-desmethyl galantamine , ক্রিনিন, ক্রিনিফলিন, ক্রিনিফলিডিন, ক্রিনামিন, ও-ডাইমিথাইল ক্রিনামিন,পাওয়েলিন, গ্লুকান A & B, মিথানল, লিনোলিয়েট, thridone, phenanthridone, সাইক্লোআর্থেনল,cyclolaudenol, 4, 5-etheno-8, 9methylenedioxy-6-স্টিগমাস্টেরল, norcyclolaudenol, লাইকোরিন, haemanthamine আছে। কন্দ এলক্যালয়েড হিপেসস্ট্রিন আর পাতা চেরিলিন ধারণ করে।
বীজে ক্রিনামিন আর লাইকোরিন এর উপস্থিতি আছে।

বিষাক্ত হলেও আবার এই সুখদর্শন এর বহু চিকিৎসায় ব্যবহার আছে।
সাধারণত হালকা সেধ করে কিংবা গরম পানিতে ফুটিয়ে এই চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু হয়।

পাতা একটু সিদ্ধ করে রস বানিয়ে নিলে সেটা নাক কানের ব্যাথ্যার জন্য খুব উপকারী।
অনেক শুনেছি কাটা দিয়ে কাটা তোলা কিন্তু আজ প্রথম দেখলাম বিষ দিয়ে বিষ নষ্ট করা। সাপের কামড়ে এই সুখদর্শনের মুলের রস নাকে ড্রপ হিসেবে দিলে বা একটু মুখে খাইয়ে দিলে আরাম পাওয়া যায়।
যাদের প্রসাব কম হয় তাদের জন্য এই উদ্ভিদটি খুন উপকারী।
অনেকের নখের গোড়ায় ইনফেকশন হয় যার সমাধান হিসেবে এই সুখদর্শন এর সেদ্ধ করা পাতার পেষ্ট কার্যকরী।

সুখদর্শন(Crinum latifolium)

তবে যেহেতু বিষাক্ত তাই এই ধরনের চিকিৎসা করে আমি অন্তত রিক্স নিবো না।
তাছাড়া সুখদর্শন এর ঘ্রাণ আমার পছন্দ হয়েছে। একটু বিষাক্ততা থাক কিন্তু এই রকম উদ্ভিদ একটা বাগানে থাকলে কন্দ দিয়ে প্রতিবছরই আমি নতুন নতুন চারা বানিয়ে বড় করতে পারবো। আর এই সুখদর্শন বহুবর্ষজীবী হওয়ায় একটা থেকে অনেক অনেক সুখের দেখা পাওয়া যাবে আশা রাখি।

ছবিঃ নিজ

রেফারেন্স :
1. ড. মোঃ আবুল হাসান 2017,  প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় ভেষজ উদ্ভিদ।
2. ড. মোঃ আবুল হাসান 2016,  পরিচিত ফুলগুলো।
3. এন.এস. নওরোজ জাহান ২০০৭,বাংলাদেশের ফুলের রাজ্য।
5. Encyclopedia of Flora & Fauna Bangladesh vol. 11.
6. Abdul Ghani 2003, Medicinal Plants of Bangladesh.
7. https://www.researchgate.net/publication/307410433
8. https://www.researchgate.net/publication/268277112
9 https://en.m.wikipedia.org/wiki/Crinum_asiaticum
10. https://easyayurveda.com/2017/07/18/spider-lily-crinum-asiaticum-poison-bulb/amp