অপ্রত্যাশিত অতিথি

0
78

মেঘ না থাকলে আকাশে অনেক তারকা থাকতো আজ রাতে। বিরতি দিয়ে দিয়ে মেঘ ডাকছে সাথে বিদ্যুত চমকানি।
তখন গভীর রাত্রি নিস্তব্ধ। গাছের ডালে আধার মিশে আছে। সবাই মিলে ভুতুড়ে পরিবেশ।
কটা বাজে চেইন ওয়ালা হাতঘড়ি টায় দেখার চেষ্টা করল সাদাত। বিদ্যুত চমকানির আলোতে ঘন্টার কাটাটার অবস্থান পরিদৃশ্যমান হলো। ঘন্টার কাটা একটার আশে পাশে।
আধার হাতড়ে পথ হাটছে সাদাত। ভয়ে জমে যাচ্ছে যেন। শহরের ল্যম্পপোস্টের আলোয় হেটে সে অভ্যস্ত। জীবনে প্রথম সে এরকম গ্রামের পথ দিয়ে হাঁটছে । উদ্দেশ্য আশরাফ হোসেনের বাড়ি।
সামনে আলো দেখতে পেল। বোধহয় কোন গঞ্জ। যেন শুধু আলো নয় আশার আলো । দ্রুত পদক্ষেপে হাটতে থাকে সাদাত। এমনিতেই গ্রামে একটু রাত হলেই সবাই ঘুমের দেশে গমন করে। আজকে আবার বৈরী আবহাওয়া। একটা দোকানে খোলা পেলো না। হাঁটতে হাটতে গঞ্জের মাথা অবধি গেল সে। একটা দোকান খোলা পেল।সাদাত যেন হাফ ছেড়ে বাচল।
এগিয়ে গেল সেদিকে। ৩ জন লোক। হিসেবে কষছে। আলু, পেয়াজ সবজির গন্ধ আসছে নাকে। গঞ্জের আড়ত।
লোক তিনজন উৎসুক চোখে তাকালো।
অপরিচিত লোক। কাধে বড় ব্যাগ। চোখে চশমা আটা। সিমসাম চেহারা।
কাছাকাছি এসে সাদাত বলল-ভাই এখানে আশরাফ হোসেনের বাড়িটা কোনদিকে?
লোকগুলো এমন ভাবে তাকালো মনে হয় জানতে চেয়ে অপরাধ করেছে ।
উত্তর না দিয়ে একজন চেলা টাইপের জিজ্ঞেস করল-আশরাফ হোসেন কে হয়?
আমার বাবার বন্ধু।
আপনার বাড়ি কোনখানে?
ঢাকা।
এটা তো কালিগঞ্জ বাজার তাই না?
হুম। কালিগঞ্জ।
চিঠিতে এই বাজারের ঠিকানাই দিয়েছিলেন। আর বলেছিলেন এখানে এসে ওনার নাম বললেই চিনবে।
হয় পাশেই বাড়ি। ১০ মিনিট হাটন লাগবে।
সাদাত বলল বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন । সমস্যা নেই আপনাকে কিছু টাকাও দেব।
চেলা টাইপের লোকটা খুশিতে গদগদ।
লন চলেন।
মালিক গোছের লোকটা বলল-আরে ভাই টাকা লাগবো না ।
ওই মুরাদ যা তো ভাইরে দিয়ে আয় গা। আর টাকা নিবি না।
মুহূর্তে রাতের আঁধারের মতো কালো হয়ে গেল চেলা টাইপের লোকটার মুখটা ।
এবার অনেকটা বাধ্য হয়েই বলল-আহেন আহেন তাড়াতাড়ি সময় নাই হাতে।
লোকটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে হাঁটতে শুরু করল ওরা ।
বাইরের প্রকৃতি আরো খানিকটা নাজুক।
বাতাস বইছে এখন। গাছগুলো মাথা আচড়াচ্ছে যেন।
তবে এখন আর ভয় লাগছে না সাদাতের। সঙ্গী থাকলে নির্জন জায়গার ভয়াবহতা কেটে যায়।
মিনিট দশেক পরেই পৌঁছালো ওরা।
বাড়ি দেখিয়ে দিয়ে বলল-এইডাই আশরাফ সাহেবের বাসা।
ধন্যবাদ।
আপনের ধন্যবাদ কি আমি ভাতে দিয়ে খাইতে পারমু?
যা দিলে ভাত খাইতে পারুম তাই দেন?
একটা পাঁচশো টাকার নোট মানিব্যাগ থেকে বের করে লোকটাকে দিল ।
পাঁচশো টাকায় আবার হাসি ফুটল চেলাটার মুখে। খুশিতে সালাম করল।
বাড়ির সদর দরজা বন্ধ। দরজায় ঠকঠক আওয়াজ করল সাদাত। বেশ কয়েকবার নক করলো সে। কোনো উত্তর আসলো না ।
মনে হয় সবাই ঘুমাইছে।
আরো জোরে দরজা ধাক্কালো সে।
এবারে কাজ হলো। বুড়ো গোছের একজন দরজা খুললো। দাড়ি চুলে ওনাকে ভয়ঙ্কর লাগলো।
কেডা আপনে?
আমি সাদাত । ঢাকা থেকে আসছি।
ওওওওও বাবু আপনের কথা বইলা গেছে।
আশরাফ আঙ্কেল কোথায়?
উনি উজানে গেছেন কি একটা কাজে । কাল আসবে ।
আপনে আসনে ভিতরে।
ভিতরে একটিমাত্র লাইট জ্বলছে। লাইটের আলোতে বেশ করেই বোঝা যাচ্ছে বাড়িটা পুরানো। পোড়া ইটের।
কিন্তু ভীষন শুনশান। ঢুকতেই রজনীগন্ধার গন্ধ নাকে এলো সাদাতের। মোহনীয় গন্ধ।
থাকার ঘরটা দেখিয়ে দিল লোকটা।
দরজা খুলে ঢুকতেই শীতল বাতাস ঢুকলো ভিতরে আর দরজা খোলার একটা অদ্ভুত শব্দ হলো।
অন্ধকার ঘর । লাইট হাতড়ালো। কিন্তু সুইচ টিপে কাজ হলো না । ফেইস কেটে গেছে মনে হয়।
ততক্ষণে বাইরে ঝড় শুরু হয়ে গেছে। খুব নিয়মিত বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তারই আলোতে ভরে যাচ্ছে ঘর।
ব্যাগটা খুলে রাখলো নিচে। ভীষণ ক্লান্তিকর একটা দিন কাটলো সাদাতের। এখন বিছানায় শুয়ে চোখ বুঝতে পারলেই শান্তি।
তখনি দরজায় টোকা।
বারবার টোকা পড়ছে দরজায়।
সিটকিনি খুলে দিতেই হন্তদন্ত হয়ে একজন মেয়ে প্রবেশ করলো ঘরে। বাইরের বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য খেয়াল ই করে নি কে দরজা খুলেছে।
বিদ্যুত চমকানির আলোতে সাদাতকে দেখে মেয়েটি চিৎকার করবার প্রায়।
সাদাত কিছু বলার আগেই মেয়েটি বলে কে আপনি?
আমার ঘরে কি? কিভাবে আসলেন এখানে?
মেয়েটির সমস্ত উৎকণ্ঠা আর প্রশ্ন এড়িয়ে সাদাত বলল-আমি সাদাত।
এতেই মেয়েটির সমস্ত উৎকণ্ঠা কেটে গেল।
ওওওওও আচ্ছা আপনি সেই নমনিত প্রার্থী।
সাদাত লক্ষ করল-মেয়েটি শরীর আধভেজা। রূপসী । আধারেও যেন আলো ছড়াচ্ছে।
সাদাতের বুঝতে বাকি রইল না মেয়েটি হচ্ছে অরণী।
এর সাথেই বিয়ের কথা চলছে। সাদাতের পচ্ছন্দ হলেই বিয়ে।
তা এত রাত করে আসলেন যে?
আসলে পথ চিনতে পারিনি আর অনির্দিষ্ট সময়ে যাত্রা করেছিলাম।
মেয়েটি ভেজা চুলগুলো নাড়তে নাড়তে বলছিল-তা কেমন লাগছে আমাকে?আপনার কি পচ্ছন্দ হল?
সাদাত বলল -আলবত। যেন সাক্ষাত পরী।
অরণী শব্দ করে হাসছে।যেন ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে সে হাসি। আর ইটের দেয়ালে বাধা ফিরে এসে সে হাসি আবার কানে দ্যোতনা তৈরি করছে সাদাতের।
হাসি থামিয়ে অরণী বলল-আচ্ছা সত্যি যদি আমি পরী কিংবা আত্মা প্রেতাত্মা হই?
কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বলল-তা হতে যাবেন কেন?
আপনি আত্মায় বিশ্বাসী না?
কিসের আত্মা?
অরণী সেই রাত্রির নির্জনতায়ও ফিসফিসিয়ে বলল-আপনাকে একটা আত্মার ঘটনা বলি।
সাদাতের মনে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হতে লাগল।
ততক্ষণে ঘরে থাকা সোফার উপর বসেছে ওরা।
বলতে শুরু করল অরণী।
একটা মেয়ে ছিল। যে ছিলি চঞ্চল মনা। খুব ছোটতেই মা মারা গেছে। মায়ের চেহারাটাও ঠিক মনে পড়ে না ওর । তাই মেয়েটি যাই করুক কিছুই বলতো না ওর বাবা । মা হীন মেয়েটি অনেক ভালবাসা কাতর ছিল।
আপনি কি শুনছেন?
হ্যা। বলুন।
তখন কলেজে পড়ত মেয়েটি। একটা অগোছালো বেপরোয়া ছেলে মেয়েটির পিছে ঘুরত। ছেলেটা এমন অনেক অদ্ভুত কান্ড করত মেয়েটির জন্য। দীর্ঘ সময় এভাবে চলার পর মেয়েটিও প্রেমে পড়ে যায় ছেলেটির। তারা যখন প্রেমে বিভোর তখনই একদিন মেয়েটির বাবা বলে তার এক বন্ধু নাকি আমাকে পচ্ছন্দ করেছেন মেয়েটিকে তার ছেলের জন্যে ।
মেয়েটি জানায় ছেলেটিকে। বেপরোয়া ছেলেটি বলে চল পালিয়ে যাই।
মেয়েটির সেটি করার সাহস হয় না । তাই তার বাবাকে জানায় সম্পর্কের কথা ।
এটা যে নিতান্তই অমূলক তা মেয়েটিও জানত। খুব সম্ভবত ছেলেটা যাবতীয় খারাপ কাজ করত।
মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমক আর আলো ঢুকছে ঘর। গল্পটা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে সাদাত।কিন্তু ভীষণ ক্লান্ত লাগছে সাদাতের। ঘুম গ্রাস করতে চাইছে তাকে।
মেয়েটি বলছে-প্রেম বুঝি বিধ্বংসী হয়। মেয়েটি আত্মহননের পথ খুঁজে নেয়। পরদিন মেয়েটির দেহ ঝুলতে দেখা যায় ঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে।
অরণী ডাকে-সাদাত সাহেব শুনছেন।
ততক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে সাদাত। গল্পের পরিণতিটুকু শোনার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে ।

পরদিন সকালে বুড়োগোছের লোকটা ডাকছে বাবু উঠেন সকালের নাস্তাটা কইরে লন।
আড়মোড়া দিয়ে ঘুম ভাঙে সাদাত। সকালে চা খেতে অভ্যস্ত সে।
বলল চাচা চা হবে?
আপনে ওঠেন আমি আনতেছি।
সাদাত অরণীকে খোঁজার চেষ্টা করল। কালকের বাকি গল্পটুকু শুনতে হবে আর সেই ছলে ওর সাথে বেশকিছুক্ষণ কথাও বলা যাবে।
মেয়েটি অদ্ভুত সুন্দর করে কথা বলে। যেন সুরেলা কন্ঠস্বর । প্রথম দর্শনে পচ্ছন্দ করার মতো সুন্দর অরণী ।
বুড়ো চাচা চা এনে দেয়। আর জানতে চায় বাবা কাল দরজা খোলা রাইখ্যা ঘুমাইছিলেন যে?
ওওও। কাল ঘরে ঢোকার পর অরণী এসেছিল।
বুড়ো চাচা তোতলাতে তোতলাতে বলে-অ অ…র র…ণী।
গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে গেছিলাম।
বুড়ো চাচা ঘটনার আকস্মিকতা এড়িয়ে ভয় মিশ্রিত কন্ঠে বলে-বাবা অরণী তো দিন দশেক হলো আত্মহত্যা করেছে ।
কথাটা শুনেই হাত থেকে চায়ের কাপটা ছুটে যায় সাদাতের।
মূহুর্তে মনে পড়ে অরণী একটি কথা। আপনাকে একটা আত্মার গল্প বলি । তাহলে অরণী কি ছিল সেই আত্মা?
সাদাত দরজাটার দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে যে দরজা দিয়ে কাল হন্তদন্ত হয়ে ঢুকেছিল অরণী….তারপর সুবিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস মিশে যায় বাতাসে ……….