উদ্ভিদের সাথে পরিচিতিঃ মধু লনিসেরা Lonicera japonica

আমাদের গল্পের জায়গায়, কার্জনহলের মেহগনি গাছের নিচে যখন বসতাম আশে পাশের গাছগুলো মুগ্ধ করতো আজো মুগ্ধ করে বলেই সেখানে বসা।
সেখানে প্লাস্টারকরা বোর্ডের পাশেই মাটিতে লতানো একটা অচেনা উদ্ভিদ ছিলো। একদিন আমি আর  আমার বন্দ্ধ শামীম বসে  ছিলাম। এইদিক ঐদিক দেখতে দেখেতেই হঠাৎ সেদিকে নজর পড়লো তাই কি ধরনের উদ্ভিদ, অসলেই অচেনা কিনা সেটা যাচাই করার জন্য কাছে গেছিলাম। দেখেছিলাম সেটা লতানো উদ্ভিদ কিন্তু কান্ডটা শক্ত, পাতাগুলো ওভাল সেপ কিন্তু সামনের প্রান্তে একিউট টিপ থাকায় পুরো পাতাটা একটা বল্লমের মত লাগে। আর একই জায়গা থেকে দুই পাশে পাতা বের হয়েছে মানে অপজিট লিফ, আরেকটা বিষয় চোখে পড়েছিলো যে কান্ডটা সবুজ না একটু লালচে বর্ণের। চিনি না বলে রেখে চলে এসেছিলাম সেদিন।

আরো কিছুদিন পর একদিন কার্জনহলের গেট দিয়ে ঢুকতে যেয়ে দেখলাম গেটের বাম পাশের বাগানে একটা লম্বা ইলেক্টিক পোল বেয়ে একটা উদ্ভিদ উঠেছে যাতে খুব সুন্দর সাদা বর্ণের ফুল ফুটে আছে।
অপরিচিত ফুল বলে কাছে যেতেই মনে হলো, এটাতো সেই মেহগনি গাছের পাশের উদ্ভিদটা মনে হচ্ছে। এটার এই রকম ফুল হয়? এখানে ফুল হয়েছে মানে সেখানেও হয়েছে হয়ত, যায় সেখানে দেখে আসি বলে চলে এলাম মেহগনি গাছের নিচে। সত্যিই এখানেও সাদা ফুল ফুটে আছে। মিষ্টি ঘ্রাণও আছে ফুলগুলোর তবে মিষ্টি হলেও কেমন একটা তীব্র ঘ্রাণ, একবার নিলে সহজে ভুলানো যায় না। একদম থোকায় থোকায় থাকে। একদম এন্থারগুলো বাইরে বের হয়ে থাকে, মাঝে মাঝে মনে হয় সে তার মুখ খুলে হা করে বসে আছে, কাছে গেলেই কামড় দিয়ে বসবে। যে কোনো জিনিস নিয়ে কত কি কল্পনা করা যায়। আরেকটা বিষয় খেয়াল করলাম ফুলগুলোর বর্ণ কিছুদিনের মধ্যেই  সাদা থেকে সোনালি হয়ে যায় আবার এটা আমার ভুল ধারণাও হতে পারে। আগে ফুল চোখে পড়ে নি বলে বেশ কিছুদিন অপরিচিতই ছিলো, অত গুরুত্ব দেয়া হয় নি কিন্তু ফুল আসার পর তার পরিচয় জানার জন্য খুব চেষ্টা করছিলাম।

Lonicera japonica

হাতের কাছে যেসব বইগুলো ছিলো সেগুলো পরিচয় পায় নি। ফ্যামিলি ধরে সামনে আগাবো তো এই উদ্ভিদের কি ফ্যামিলি সেটাও বুঝতে পারছিলাম না। নেট তো আছে কিন্তু সঠিক নাম না বললে নেটও কিছু বলে না। এককথায় অপরিচিতা আমার কাছে অপরিচিতা হয়েই একটা বছর থেকে গেছিলো। সেইদিন হঠাৎ কোথায় যেন দেখলাম, ফেসবুকেই মনে হয়, স্ক্রল করতে করতে একটা ফুলে চোখ আটকে গেছিলো, একটা ফুলের নাম সহ কেউ একজন ছবি দিয়েছে। ফুলটা সেই মেহগনি গাছের পাশে যে ফুলগুলো দেখেছিলাম তার সাথে মিলে যায়। ব্যাস, সাথে সাথে ইন্টারনেট, নামের সাথে আমার দেখা উদ্ভিদের সম্পূর্ণ মিল আছে। আরেকটু কনফার্ম হওয়ার জন্য আমার সবচেয়ে উপকারী বন্ধু “প্লান্ট ডাইভার্সিটি  অফ ঢাকা ইউনিভার্সিটি” পিডিএফ ফাইলটাতে নামটা খুঁজে দেখলাম। হ্যাঁ আছে, এই নাম তাহলে সেই অপরিচিতার। কি যে আনন্দ লেগেছিলো নামটা পেয়ে।
নাম তার মধু লনিসেরা, ইংরেজিতে জাপানিজ হানিস্যাকল(Japanese honeysuckle) আর বৈজ্ঞানিক ভাষায় Lonicera japonica     Thunb .
এর পরিবার হলো Caprifoliaceae.

একটু নামগুলো নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যাক।  হানিস্যাকল একটা সাধারণ নাম। যে সব উদ্ভিদগুলোর ফুলের ভিতরে মিষ্টি মধু পাওয়া যায় তাদেরকে এই হানিস্যাকল(honeysuckle) নামে ডাকা হয়। এপর্যন্ত মোট ১৮০ টি প্রজাতির উদ্ভিদ এই নামে পরিচিত যাদের সবাইকে Caprifoliaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরেকটু ইতিহাস দেখলে পাওয়া যায় যে বিজ্ঞানী এডাম লনিসের এর নাম থেকে এই জেনাসের নাম লনিসের(lonicera) রাখা হয়েছে। আর আমার দেখা উদ্ভিদটি জাপানে পাওয়া যায় তাই জাপান থেকে japonica.  তাই পুরো নাম Lonicera japonica.
ফুলগুলো সৌন্দর্য বর্ধক হলেও বিভিন্নদেশে বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডে এটি আগাছা হিসেবে পরিচিত। এরা বীজের মাধ্যমে খুব দ্রুত বংশ বিস্তার করে একটি ফাঁকা উদ্ভিদ শূণ্য স্থানকেও সবুজে ভরিয়ে তুলত্ব পারে অনায়াসে।
এই লতানো উদ্ভিদটি কোনোকিছু বেয়ে উঠতে পারে অনেক দূর পর্যন্ত। প্রায় ১০ মিটারও ছাড়িয়ে যেতে পারে গাছ বেয়ে উঠার সুযোগ পেলে।

এইবার এর ভিতরের সম্পদ নিয়ে কিছু বলি,
এই মধু লনিসেরায় গুরুত্বপূর্ণ তেলের কিছু উপাদান trans-nerolidol (16.31%), caryophyllene oxide(11.15%), linalool(8.61%), p-cymene (7.43%), hexadecanoic acid (6.39%), eugenol
(6.13%), geraniol (5.01%), trans-linalo oloxide (3.75%), globulol(2.34%), pentadecanoic acid (2.25%), veridiflorol (1.83%), benzylalcohol (1.63%) and phenylethyl alcohol (1.25%) এবং সামান্য পরিমানেcitronellyl acetate (0.97%), geranylacetone (0.92%), hexahy-drofarnesyl acetone (0.87%), a-cadinol (0.85%), tetradecanoic acid(0.85%), dodecanal (0.83%), aromadendrene (0.82%), and 1,8-cine-ole (0.81%) পাওয়া যায়। এক কথায় ইনি তেলের ভালোই সঞ্চয় করেন।

যেগুলোর কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাদেরই নাম বলি, বাকিদের নাম বলে শুধু শুধুই মাথা গরম করিয়ে লাভ নাই। এর  3-O-caffeoyl quinic acid, secoxyloganin, Luteoloside, 3,5-di-O-caffeoyl quinic acid, 4,5-di-O-caffeoyl quinic acid উপাদানগুলোই কার্যকরী বেশী।  একাধারে এন্টি-মারক্রোবিয়াল, এন্টি-ইমফ্লামেন্টরী হিসেবে কাজ করে। এর এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতা পটাশিয়াম সরবেট কিংবা সোডিয়াম বেনজয়েট এর মত ভালো প্রিজারভেটিভসের চেয়েও বেশি বলে এই মধু লনিসেরার পাতা বিভিন্ন ফুড কোম্পানিতে ব্যবহারের চিন্তাভাবনা চলছে। চলবে নাই বা কেন, দেশের আগাছাও সাফ হচ্ছে আবার ফ্রিতে সহজেই উপাদানের উৎসও পেয়ে যাচ্ছে।

যাই হোক না কেন,  দিন শেষে মিষ্টি মধুর প্রাকৃতিক একটা উৎসের সন্ধান পেলাম। এছাড়াও পেলাম চায়ের এক বিকল্প।  যখন মন চাইবে একটা ফুল, ফুল না পেলে পাতা দিয়ে পেয়ে যাবো এক কাপ চায়ের মত প্রশান্তির স্বাদ।


রেফারেন্স :

  1. Encyclopedia of Flora & Fauna Bangladesh vol. 7.
  2. https://www.nature.com/articles/srep12696
  3. https://www.researchgate.net/publication/255619675
  4. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Lonicera_japonica
  5. https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0308814609003045
  6. https://www.researchgate.net/publication/307410433
0 0 vote
Article Rating

About Md. Siddiq Hasan

Md. Siddiq Hasan
Wants to live in the Nature where every living being is known to me...

Check Also

Classification of Medicinal Plants

Before classification we have to know what is a medicinal plant. There are many definitions.  …

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x