উদ্ভিদপ্রেমীদের চোখে কার্জনহল দেখতে যেমন

0
235
Curzon Hall, University of Dhaka

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের গাছের নাম জানা শুরু হয় কার্জনের গাছ দেখেই। কত হরেক রকম গাছ আছে আমাদের এই কার্জনে, আর উদ্ভিদবিজ্ঞানের বাগানে ঢুকলে তো কথাই নেই। তবুও বাস্তবতা হচ্ছে চোখের সামনের অধ্যয়নের বিষয় থাকলেও চার বছর ধরে দেখা এই গাছগুলোর নাম জিজ্ঞেস করা হলে হয়তো আমাদের উদ্ভিদবিজ্ঞানেরই অনেক ছাত্র নাম বলতে পারবে না। যদিও অনেক বার নিজেরা চেষ্টা করেছি মুখস্ত করার তবুও হয়ে উঠে নি চেনা- এই গল্পটাই বলবে বেশিরভাগ।

আজকে আমরা এই কার্জনের গাছগুলির পরিচিতি নিয়েই এসেছি। যেহেতু গাছের সংখ্যা অনেক, তাই এই পর্বে আমরা শুধু বড় গাছগুলোকেই চিনে রাখবো। যা খুব সহজেই আমাদের নজর কাড়ে এবং হয়তো আমরা সবাইই কমবেশি এই গাছগুলোর ছায়ায় বসে আড্ডা দিয়েছি। অবস্থান সাপেক্ষে এরকম বড় বৃক্ষগুলির স্বল্প পরিচয় আশা করি সবাইকে গাছ চিনতে এবং তার উপকারীতা সম্পর্কে জানতে উৎসাহিত করবে।

কার্জনের যেসব গাছ নিয়ে কথা বলবো এ পর্যায়ে তাদের তালিকাঃ

  1. দেবকাঞ্চন
  2. বকুল
  3. সজিনা
  4. আমলকি
  5. তেতুল
  6. জারুল
  7. পলাশ
  8. গোলাপি কাঠগোলাপ
  9. শেওড়া
  10. মেহগনি
  11. নাগলিংগম
  12. কুরচি
  13. রাজকড়ই
  14. ইউক্যালিপটাস
  15. বসন্ত মঞ্জরী
  16. কাঠগোলাপ এবং
  17. বোতলপাম

কার্জন হলে যেতেই হাতের বাম পাশে, কার্জনহল এর বাম পাশের দেয়াল ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে দেবকাঞ্চন। এর বৈজ্ঞানিক নাম Bauhinia purpurea L.

Bauhinia purpurea L.

এটি একটি চিরহরিৎ উদ্ভিদ, আকারে খুব একটা বড় হয় না, খুব জোর ৪-১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এই দেব কাঞ্চনের ফুল খু সুন্দর দেখতে। একে আমি খু সহজে চিনি এর পাতা দেখে। পাতাগুলো দেখলে মনে হয় দুইটা পাতাকে একসাথে গোড়ার দিক থেকে জোড়া লাগানো হয়েছে কিন্তু প্রান্তের দিক জোড়া লাগানো হয় নি। মানে মধ্যশিরা বরাবর একটা বড় খাঁজ আছে যেটা তাকে অন্যান্য গাছের থেকে আলাদা করে তুলেছে।

তারপর আসে বকুল গাছ। বকুল গাছকে কেই বা না চিনে। খুব সুন্দর লম্বা গোলগাল একটা গাছ। Mimusops elengi L. নামে বিজ্ঞানীরা ভালো চিনি।

বকুল, Mimusops elengi L.

বকুল ফুলকে ছোট খাটো একটা সাদা শাপলার সাথে তুলনা করলে ভুল হবে না কিন্তু এর ঘ্রাণের কোনো জুড়ি নেই যার সাথে তুলনা করা যায়। আর ডালে ডালে যখন লাল লাল ফল ধরে থাকে খুব ভালো লাগে দেখতে।

বকুলের পরেই দেখা মিলে সাজনারMoringa oleifera নাম দিয়ে গেছেন বিজ্ঞানী ল্যামার্ক।

এই সাজনার বহু গুন। আমাদের গ্রামের দিকে বাসায় বাসায় সাজনা একটা করে গাছ। এর ভঙ্গুর কান্ডের জন্য সাধারণত খুব একটা বড় না হলেও ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে দেখা যায়। কান্ড নিয়ে যখন বলছি তখন এর কান্ডের আরেকটু বর্ণনা দিয়েই দিই। এর কান্ড দেখেই মনে হয় দুর্বল, কর্কের মত দেখতে কিছুটা যদিও কচি অবস্থায় একটু সবুজ বর্ণের হয়। আর এর পাতা দেখে অনেকেই কড়ই মনে করতে পারে কিন্তু একটু ভালোভাবে দেখলে বুঝা যায় কড়ই এর পাতার সাথে সাজনা পাতার গঠন এবং সজ্জায় একটু ভিন্নতা আছে। তাছাড়া এর ফুলগুলোও তো ভিন্ন যা উপযুক্ত পরিবেশে বছরে দুই বার দেখা দিতে পারে। ও, সাজনার একটা গুন সম্পর্কে না বললেই না। এর বেচে যাবার ক্ষমতা মানে রিজেনেরেশন পাওয়ার এতটাই বেশি যে মাত্র ১.৫-২ হাতের সমান একটা ডাল মাটিতে রোপণ করলেও সেখান থেকে নতুন গাছ জন্মাতে পারে। মজার বৈশিষ্ট্য না!

এরপর আমলকি বা আমলার কথা। Phyllanthus emblica L. নামে পরিচিত এই আমলকি অনেকেই চিনি কিন্তু আমলকির গাছ দেখেছি এমন আছে কয় জন। সমস্যা নাই, আজ এখানেই দেখা পাওয়া যাবে এর।

আমলকির পাতা যৌগিক এবং দেখতে কিছুটা দ্বিধার বিশিষ্ট করাতের মত। গাছে যখন আমলকি পরিপক্ব হয় তখন পাতা ঝরে গেলেও প্রায় ২০ মিটারের মত উঁচু গাছ থেকে আমলকি সংগ্রহ করা খুব একটা সহজ কাজ না।

এই দিক দিয়ে আবার তেতুলের গাছ একটু সংরক্ষণশীল, পাতা দিয়ে তেতুলকে আড়াল করে রাখে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Tamarindus indica L

রাখবেই বা না কেন, বিশালাকার কান্ড, ২৪ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখার পরও পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে একটা ঢিল ছুঁড়ে একটা তেতুল পেড়ে খেতে একবার না একবার মন চাইবেই।

পানি জারুল নামেই তাকে চিনি বৈজ্ঞানিক নাম Lagerstroemia floribunda.

কিন্তু অন্য নামও প্রচলিত আছে। জারুলের পরিবারের তো তাই ফুলগুলো দেখতে জারুলের মতই কিন্তু এর সাদা, গোলাপি দুই তিন বর্ণের মিশ্রণ একে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বড় ধরনের গাছ।

পলাশ এর দেখা পাওয়া যায় একটু ভিতরের দিকে। Butea monosperma নামে খ্যাত এই পলাশের ফুল তো সবাই চিনে। সেই থরে থরে পলাশের গান কে বা না শুনেছে।

পলাশের গাছ চেনার এক উপায় এর পাতা। একই গাছে দুই ধরনের পাতা দেখা যায় আর পাতার আকারটাও খুব মজাদার, গোলগাল, চ্যাপ্টা।
গোলাপি কাঠগোলাপ আছে তার পাশে। লাল, গোলাপি মিশিয়ে সুন্দর এক রুপ হয়েছে তার।

আরো বেশি জানতে হলে এর বৈজ্ঞানিক নামটা Plumeria rubra এটা জেনে নেন, এটিই হবে আপনার খোঁজের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

কার্জনহল এর মাঝ দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। সেই রাস্তার দুই পাশ জুড়ে সারে সারে লাগানো নাগেশ্বর.

নাগেশ্বর, Mesua ferrea L.

খুব সুন্দর ভাবে কেটে গোলগাল বানিয়ে রেখেছে এই গাছগুলোকে। নাগেশ্বরের ফুলগুলো খুব সুন্দর হলেও আমাকে এর কচি পাতাগুলো বেশি টানে। ভালোই লাগে এর পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন দেখে। প্রথমে কচি পাতাগুলো লাল তারপর হালকা লাল এবং পরিনত বয়সে যেয়ে সবুজে পরিনত হয়। এদের সবুজে পরিনত হতে হতেই আবারো নতুনভাবে কচি পাতা চলে আসে। আর গাছে তো মনে হয় সারা বছরই ফল ঝুলে থাকতে দেখতে পাই। টাকটা দুটি বীজ কুড়িয়ে বাড়ি দিয়ে ঠক করে শব্দ করে যা শুনতে খুব ভালো লাগে।

এতক্ষণ তো শুধু চারিদিকের সীমান্ত ঘেঁষে গাছগুলোর বর্ণনা দিচ্ছিলাম। আর এইসব গাছগুলোর মাঝে মাঝে আছে যে গাছগুলো আছে সেগুলোর একটি শেওড়া

শেওড়া, Streblus asper Lour.

এটি খুব পরিচিত একটি গাছ কিন্তু যে জন্য সে এত পরিচিতি পেয়েছে বাস্তবে এতে ভূত বলে কিছু থাকে না। আমি একে চিনি এর খসখসে পাতায়। বল্লম আকৃতির পাতা আর কেমন একটু কুড়মুড়ে ভাব আছে। সচারাচর ছোট দেখতে পেলেও এই গাছ কিন্তু ২৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। দূর থেকে অন্যান্য গাছের থেকে একে দেখতে একটু কালো বলে মনে হয়।

মেহগনি তো তার বিশালাকৃতির দেহের জন্যই রোপিত হয়। বেশ ভালো মানের কাঠ পাওয়া যায়।

মেহগনি, Swietenia mahagoni (L.) Jacq.

মেলিএসি পরিবারের বলে পাতার একটা পাশ একটু চাপা হয় আর দেহের বাকলগুলো ফেটে যায় বলে একে চিনতে মোটেও অসুবিধা হয় না। ও, এর ফল গুলো দেখে মনে হবে এক একটা মাইক্রোফোন, যেন সে সেগুলো দিয়ে সবার কথা শুনে।

Couroupita guanensis abul. নামে যে আছে সেই নাগলিংগম বা ক্যানন বল গাছের এর বর্ণনা দেয়ার আগে তার ফুলের বর্ণনাটা দিয়ে ফেলি কারণ এমন ফুল আর দ্বিতীয় আছে কি না সন্দেহ আছে।

নাগলিংগ, Couroupita guianensis Aubl.

চমৎকার তার গঠন লাল পাপড়ি আর তার মাঝে আছে অনেক অনেক এন্থার যেগুলো সুন্দর ভাবে বিন্যস্ত। এর পাতাগুলোও তেলচকচকে সুশ্রী রূপ। ফুলের দেখা না পেলে এতে ঝুলতে থাকা কামানের গোলার মত ফল দেখেও একে চেনা যায়।

দুইধারে নাগলিংগম আর তাদের মাঝে কুরচি,। শুদ্ধ ভাষায় Holarrhena antidysenterica (L.) Wall. ex A. DC আরো কিছু নামের একটি হৈমন্তী।

এই উদ্ভিদটার ফুলগুলো সুভ্র সাদার একটি সুন্দর উদাহরণ। যখন ফুল ধরে তখন এর পাতাগুলো ঝরে গিয়ে পুরো গাছটাই শুধু দেখা যায় মন কাড়া সাদা সাদা ফুলগুচ্ছ।

এই কুরচির পাশেই আবার ইয়া লম্বা একটা রাজ কড়ই এর গাছ দাঁড়িয়ে আছে, আমার তো আবার রাজ কড়ই এর চেয়ে গগন শিরিষ নামটাই বেশি পছন্দ। বৈজ্ঞানিক নাম হলো Albizia richardiana (Voigt) King & Prain.

গগন শিরি, Albizia richardiana (Voigt) King & Prain

আমাদের ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের বড় বড় গাছগুলোর মধ্যে এটি একটা। নিচে কোনো ডালপালা কিছুই না একদম কান্ডটা অনেক উঁচুতে গিয়ে অল্পকিছু পাতা আর শাখা দেখা যায়। এতই উঁচু যে এর ফল ফুল প্রতিবছর হলেও এপর্যন্ত আমার চোখে দেখার সৌভাগ্য হয় নি।

এতক্ষণ শুধু বাম পাশই দেখলাম, এবার একটউ ডান দিকেও দেখি কি আছে।
ডান পাশে চোখ মেললেই যা আছে দেখা যায় তার প্রথমটা হলো ইউক্যালিপটাস। এটা লেবু পাতার সুগন্ধ বিশিষ্ট একটা গাছ যার বৈজ্ঞানিক নাম Eucalyptus citriodora.

দেখে মনে হয় কেউ সাদা চুন এর দেহে লাগিয়ে দিয়েছে। বেশ লম্বা চওড়া একটা গাছ ভুতের মত ইলেকট্রিক এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের একটা কোনায় দাঁড়িয়ে আছে।

ছবিঃ Shahidul islam shamim

আর এই ডিপার্টমেন্ট এর সামনে আছে বসন্তমঞ্জরী

এই বসন্তমঞ্জরীর কান্ডটা দেখে হয়ত কিছুটা রোগাক্রান্ত হাড় সদৃশ কোনো দেহ মনে হতে পারে কিন্তু যখন এর গোলাপি বর্ণের ফুল আসে তখন এর রুপ হয়ে উঠে আকর্ষণীয়।

তবে এই ডিপার্টমেন্টের শেষ প্রান্তে যার ফুল সর্বদায় চোখে পড়ে সেটা হলো কাঠগোলাপ। থোকায় থোকায় ধরে থাকে সাদা সাদা কাঠগোলাপ। এই কাঠগোলাপের বৈজ্ঞানিক নাম Plumeria alba.

এর পাতা গুলোর টিপটা একিউট আর Plumeria obtusa নামে যে কাঠগোলাপ দেখি সেটির পাতার টিপটা গোল হয়।

বোতল পাম নামে এক গাছ আছে কার্জনহল গেটের সামনে। 

বোতল পাম, Hyophorbe lagenicaulis (L.H.Bailey) H.E.Moore

নাম Roystonea regia. প্রথমে দেখে পামগাছ বলে ভুল করেছিলাম কিন্তু এর কান্ডটায় আছে পাম কিংবা তাল গাছের থেকে একটু ভিন্নতা। তাছাড়া এই গাছগুলো এখন রাস্তার ধারে বেশি যাচ্ছে এর দ্রুত বৃদ্ধির জন্য।

আজকে এটুকুই থাক, ইনশাআল্লাহ অন্য কোনো দিন আরো কিছু কার্জনের বড় গাছ গুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো।